how to protect mental health from coronavirus
  • Save
Lifestyle

করোনা ভাইরাসঃ কিভাবে আপনার মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা করবেন

৩১ ডিসেম্বর -২০১৯, World Health Organization (WHO) চায়না কে সতর্ক করে উহান এর বেশ কিছু মানুষের অস্বাভাবিক নিউমোনিয়া রোগে আক্রান্ত হওয়া রোগীদের আক্রান্ত হওয়ার ব্যাপারে। চায়নার উহানে এই ভাইরাস প্রথম চিহ্নিত হয় যার নামকরণ করা হয় কোভিড-১৯। নভেল করোনা ভাইরাস হলো করোনা ভাইরাস এর নতুন এক প্রজাতি। এই ভাইরাস এতোটাই ভয়াবহ যে এর মাধ্যমে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে একজন মানুষ থেকে অন্য মানুষ এর মাঝে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই কোভিড-১৯ কে মহামারী হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

এই মহামারী শুরু হবার পরে থেকেই বিশ্বের সবচেয়ে নামকরা গণমাধ্যম থেকে শুরু করে আলজাজিরা, বিবিসি নিউজ সহ আমাদের বাংলাদেশের সকল টেলিভিশন চ্যানেল থেকে শুরু করে সব নিউজপেপার এই করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হবার নিউজ সহ মানুষ মৃত্যুর হার জানানো হচ্ছে। একই সাথে সকল অনলাইন মিডিয়া এবং অনলাইন নিউজেও করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত খবর জানানো হচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। করোনা ভাইরাস অতি দ্রুত ছড়ানোর কারণে মানুষ এর মাঝে অনেক বেশি আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। আর একই সাথে করোনা ভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক এখনো না আবিষ্কার হবার কারণে সাধারণ মানুষ অনিশ্চয়তার মাঝে জীবন যাপন করছে।

পৃথিবীর প্রায় অনেক দেশ যেমন ইতালি, স্পেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইন্ডিয়াতে ব্যাপকভাবে খুব কম সময়ে করোনা ভাইরাস মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ায় দেশগুলি লকডাউন করে রেখেছে এবং নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে বিশ্বের অন্য দেশের সাথে যাতায়াত ব্যাবস্থা এমন কি কেউ এখন প্রয়োজন ব্যাতীত বাইরেও কম বের হচ্ছেন। অন্যদিকে প্রায় সব অফিস কার্যালয় থেকে কর্মীদের বাসায় থেকে অফিস করার জন্য নিয়ম করা হয়েছে।

করোনা ভাইরাস মানুষের মাঝে যে উদবিগ্নতা,যে ভয়াবহ আতঙ্ক বিরাজমান রেখেছে তাতে সাধারণ মানুষ প্রতি মুহূর্তে ভীতসন্ত্রস্থতার মধ্য দিয়ে পাড়ি দিচ্ছেন। যেহেতু করোনা ভাইরাস সংক্রামক ব্যাধি তাই সাধারণ মানুষ আরো বেশি উদ্বিগ্ন। কোটি কোটি মানুষ এজন্য চিন্তিত অনেক বেশি পরিমাণে। আর এই উদবিগ্নতা,দুশ্চিন্তা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের উপরে ভয়াবহ প্রভাব বিস্তার করছে। আমাদের অনেক মানুষের মাঝেই আছে শুচিবায়ুর মতো মানসিক সমস্যা। একইসাথে এদের মাঝে আছে প্রায় সময়ই দুশ্চিন্তা করার মতো মানসিক সমস্যা যা এই সময়ে এই শ্রেণীর মানুষের মাঝে আরো তাদের মানসিক সমস্যাকে বৃদ্ধি করছে।

Anxiety UK নামক প্রতিষ্ঠানের নিকি লিডবেটার বলেছেন “দুশ্চিন্তার সাথে সম্পর্কিত বেশ কিছু মানসিক  সমস্যার একটা বৈশিষ্ট্য হল,অনিশ্চয়তা সহ্য করতে না পারার ক্ষমতা এবং নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলার ভয়।”

এই পরিস্থিতিতে নিজের এই মানসিক সমস্যা মুখোমুখি হবার প্রয়োজনও  কিন্তু আছে, নতুবা এই প্রভাবসমূহ পারিবারিক কিংবা সামাজিক ভাবে তৈরি করতে পারে আরো বেশি ভয়াবহতা। এই গুরুতর বিষয়সমূহ যেনো স্থায়ী না হয় সেজন্য আমাদের সকলেরই উচিত বেশি দুশ্চিন্তা না করা। চলুন জেনে নেই কিভাবে আমরা নিজেকে আতঙ্ক থেকে দূরে আর নিজেকে দুশ্চিন্তামুক্ত রাখতে পারি।

প্রতি মুহূর্তের খবর না দেখা

বর্তমানে ইন্টারনেট বাংলাদেশ সহ বিশ্বের সকল দেশে অনেক বেশি সহজলভ্য এবং একই সাথে প্রায় ১৫ বছর এর বালক বালিকা থেকে শুরু করে সকলের হাতেই স্মার্ট মোবাইল আছে। এই স্মার্টফোন আর সহজলভ্য ইন্টার্নেট এর সুবিধা থাকায় সকলেই খুব সহজে জেনে নিতে পারছেন কখন কোন দেশে কোথায় কি হচ্ছে মূলত করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত সকল তথ্য সকলের কাছে এখন্ সহজে চলে আসছে মুহূর্তের মাঝে। আর এমন খবরগুলি ইন্টারনেট, টেলিভিশন চ্যানেলে, নিউজপেপারে দেখে সকলেই আরো বেশি দুশ্চিন্তায় পড়ে যাচ্ছে। তাই সকলের উচিত হবে সবসময় এই নিউজ না দেখা।

সোস্যাল মিডিয়ায় সময় কম দেয়া

আধুনিক এই যুগে প্রায় প্রত্যেকের নিজের সোশ্যাল মিডিয়াতে আছে নিজস্ব একাউন্ট। সোস্যাল মিডিয়া যেমনঃ ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, লিংকডইন, টুইটার এইসব সোস্যাল মিডিয়াতেই এখন এক হট টপিক হলো করোনা ভাইরাস। বিশ্বের নামীদামী দেশগুলি যেখানে লকডাউন হয়ে আছে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ যেখানে নিজেকে ঘরবন্দী করে রেখেছে। কিন্তু কিছু মানুষ তবুও ঘরের বাইরে আনাগোনা করছে এবং সেটিই নিউজে চলে আসায় মানুষ আরো বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে। কারণ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও বেড়েই চলেছে হুড়হুড় করে।এই উদ্বিগ্নতা আরো বেশি যেনো না বাড়ে সেজন্য আমাদের উচিত হবে সোস্যাল মিডিয়ায় সবসময় উপস্থিত না হওয়া। আপনার প্রোফাইল থেকে আপাতত লগআউট হয়ে নিজের শখের কোনো কাজে মন দিন বা ব্যাস্ত থাকুন নিজস্ব প্রয়োজনীয় কাজে।

গুজবে কান না দেয়া

ইন্টারনেটে যেমন খুব সহজেই মানুষ জেনে নিতে পারছে আপডেট নিউজ থেকে শুরু করে সবকিছু তেমনি এই ইন্টারনেট দুনিয়াতে “গুজব” ও ছড়াচ্ছে খুব সহজে। তাই এখুনি চেষ্টা করুন যেসব জায়গা থেকে গুজব জানতে পারছেন সেসব এড়িয়ে চলা। প্রতিবেশী দেশ ভারতে ক্ষমতায় থাকা বিজেপির অনেক হিন্দু ধর্মাবলম্বী নেতা ই বলছেন “গরুর প্রসাব পানে মিলবে করোনা নামক প্রাণঘাতী ভাইরাস থেকে রক্ষা”। এজন্য তারা খোলাখুলি জমায়েত করে পাণ করছে গরুর প্রসাব। এদিকে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা যেখানে নেই গরুর প্রসাবে করোনা থেকে মুক্তি, তাই এইসব গুজব থেকে চেষ্টা করা উচিত নিজেকে বাঁচিয়ে চলা এবং এরকম কোনো উপদেশ না বুঝেই পালন করবেন না।

অন্যদিকে আমাদের বাংলাদেশেও গুজবের কমতি নেই। এইতো সেদিনই কেউ একজন স্বপ্নে দেখেছেন “থানকুনি পাতা খেলে বা সংগ্রহ করলে মিলবে করোনা থেকে মুক্তি”। এই বিষয়েও নেই কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি। তাই এমন গুজব কানেও নেবেন না আবার অন্যকেও শোনাবেন না বা সোস্যাল মিডিয়ায় ছড়াবেন না।

পরিবারকে সময় দেয়া

আমাদের মাঝে অনেক ব্যাস্ততা কাজ করে অফিস চলাকালীন বা ব্যাবসা চলাকালীন সময়ে। এ কারণে আমরা মোটেই নিজেদের পরিবার এর মানুষকে সময় দিতে পারি না। বাবা-মা,ভাই-বোন এই মানুষগুলি আমাদের অনেক আপঞ্জন,আমাদের উচিত হবে এই লকডাউনের সময়ে পরিবারে মানুষকে সময় দেয়া। আর যদি কারো একক পরিবার থাকে তাহলে স্ত্রীকে পারিবারিক কাজে সহায়তা করা এবং তার সাথে আরো সুসম্পর্ক বজায় রাখা হবে এখন ই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হলো পরিবারের মানুষ। আপনার পরিবার ঠিক থাকলে কাজের প্রতি মন আসবে আরো বেশি আর সামাজিকভাবে আর মানসিকভাবে থাকবেন আপনি প্রফুল্ল।

আড্ডা যেভাবে দেবেন

আমরা সবাই বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেই কেউ চায়ের স্টলে বা কেউ এলাকার মানুষের সাথে। এই কঠিন সময়ে কাউকে নিজের বাসায় আসতে না দিয়ে নিজেকে সুরক্ষা করার পাশাপাশি কথা বলুন ফোনে কিংবা চ্যাট করুন ইন্টারনেতে। খেয়াল করবেন আপনি হবেন মানসিক ভাবে আগের চেয়েও অনেক শক্তিশালী।আর আত্মীয়সজন,পাড়া-প্রতিবেশীর ও খোঁজ রাখুন একইভাবে।

অলসতা কাটিয়ে নিজেকে কর্মচঞ্চল করুন

ঘরবন্দী থেকে খুব স্বাভাবিকভাবেই আমরা অলস অনুভব করি। এইকারণে আমাদের মাঝে দানা বাঁধে দুশ্চিন্তা। এইজন্য উচিত হবে সারাদিন শুয়ে বসে আর না ঘুমিয়ে বই পড়া, নতুন কোনো মুভি দেখা।এই সুযোগে আপনি রান্নাও শিখে ফেলতে পারেন। বাইরের খাবার খেয়ে আরো বেশি নিজেকে হতাশায় না ডুবিয়ে শিখুন রান্না, অথবা কারো পূর্বের শখ থাকলে শিখুন গিটার বাজানো।

নিজের ব্যাক্তিগত স্কিল বাড়ানোর সুযোগ এখনই

জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আরো এক ধাপ নিজেকে উন্নত করতে নিজেকে জীবন রেইসে এগিয়ে রাখতে নতুন কোনো টিউটোরিয়াল শিখুন। এসময়কে কাজে লাগিয়ে নিজে নিজে মাইক্রোসফট এক্সেল এর ব্যাসিক থেকে এডভান্সড কাজ শিখে ফেলুন যাতে আপনি আরো সহজে অফিসের বা ব্যবসায়িক কাজ শিখতে পারেন। যদি আপনি ওয়েব ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিং ইত্যাদি শিখতে চান এইটাই সুযোগ। ইউটিউবে শুধু গান, সিনেমা দেখে সময় নষ্ট না করে ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, গ্রাফিক ডিজাইন শিখুন। খুব সহজেই আপনি ডেটা সাইন্স, ডেটা এনালিটিক্স শিখে নিজেকে করতে পারেন আরো আপডেট। যাদের কোডিং পছন্দ তারা এখন শিখে ফেলতে পারেন ডটনেট, জাভা, এন্ড্রয়েড প্রোগ্রামিং।

ব্যাচেলরদের জন্য করণীয়

ব্যাচেলর অনেকেই আছেন যারা বাসার কাজ করেন না বা দিনের পর দিন নিজের বেড পরিষ্কার করেন না। এখন ই সুযোগ নিজেকে পরিষ্কার রাখুন। একই সাথে নিজেকে করুন কর্মচঞ্চল। রান্না না জানলে ইউটিউব দেখে বা ফোনের দ্বারা মায়ের কাছে শুনে বা স্ত্রীর কাছে শুনে শিখে ফেলুন প্রয়োজনীয় রান্না।

উপরের এই কাজগুলি যদি আমরা নিজেদের দৈনন্দিন জীবনে সম্পন্ন করি দেখা যাবে আমাদের মাঝে যে করোনা নামক ভাইরাসের বীজ নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে আমাদের মন থেকে। একই সাথে হতাশা থেকেও পাওয়া যাবে মুক্তি।সন্দেহ চিন্তাভাবনা দূর করতে অবশ্যই এই সময় নিজেকে দূরে রাখতে হবে খুব জরূরী সময়ে। প্রয়োজনে বাজারে গেলে মাস্ক ব্যাবহার করুন। প্রয়োজন ছাড়া এড়িয়ে চলুন পরিচিতজনকে, হ্যান্ডশেক করা থেকে বিরত থাকুন ভরা বাজারে। কারণ করোনা ভিড়ের মাঝেই বেশি ছড়ায়। আর নিজেকে সুস্থ রাখতে অবশ্যই ঘরে ফিরে গোসল সেরে নিন আর কাপড় পারলে ধুয়ে রোদে মেলে দিন। তাহলে যে জীবাণু লাগবে তা নিমেষেই নিজ সচেতনতায় আর বিস্তার ঘটাতে পারবে না। অবশ্যই এই সময় নিজ ধর্মের অনুযায়ী প্রার্থনা করুন নিজের সৃষ্টিকর্তার কাছে। কিন্তু আপাতত চেষ্টা করুন মসজিদ,মন্দির,গীর্জায় যেনো না যেতে হয়।অবশ্যই নিজেকে পজিটিভ রাখুন, সুস্থ থাকুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *